House Of Soul

Reg. No: S0018301 of 2021-2022

+91 9674173922

hos.kol2021@gmail.com

A-81, New Raipur Road

Kolkata 700 084

Blog

সুন্দরবনের সৌন্দর্য্য

গত দুই বছর কোরোনার ভয়ে কোথাও না যেতে পেরে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। মাসখানেক আগে আমার কলেজের বন্ধু ধূর্জটির সুন্দরবনে বেড়াতে যাবার প্রস্তাব পেয়ে দু’হাতে লুফে নিলাম। ঠিক হলো ১৮ থেকে ২০ ডিসেম্বর – তিন দিন, দু’ রাত আমরা কলেজের বন্ধুরা মিলে যাবো।

গত দুই বছর কোরোনার ভয়ে কোথাও না যেতে পেরে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। মাসখানেক আগে আমার কলেজের বন্ধু ধূর্জটির সুন্দরবনে বেড়াতে যাবার প্রস্তাব পেয়ে দু’হাতে লুফে নিলাম। ঠিক হলো ১৮ থেকে ২০ ডিসেম্বর – তিন দিন, দু’ রাত আমরা কলেজের বন্ধুরা মিলে যাবো। সস্ত্রীক যাওয়াতেও আপত্তি নেই। একসাথে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া সবই হবে। এর বেশী আর কি চাই!

সুন্দরবন বেড়াতে যাবার কথা বললেই সবার আগে লোকের মনে আসে রয়াল বেঙ্গল টাইগার। ফিরে এসে একটাই প্রশ্ন – কটা বাঘ দেখলি? অনেক আশা নিয়ে যাওয়া আর বাঘ না দেখে নিরাশ হয়ে ফেরা। ভাবটা যেন বাঘই যদি না দেখলাম তবে যাওয়াটাই বৃথা। এই নিরাশ হওয়া থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো সুন্দরবনকে দেখা, একটু চেনার চেষ্টা করা। ওখানকার মানুষদের বেঁচে থাকার দৈনন্দিন লড়াইয়ের সম্বন্ধে একটু জানা। পারলে একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

অবশেষে সেই দিন এলো। আমরা বারোজন মিলে সকাল আটটায় ১৪ সীটার টাটা উইঙ্গারে চড়ে বসলাম। তিনঘন্টায় গদখালি। লঞ্চ আগের থেকেই বলা ছিল। নিমাই ও তার সাগরেদ বিশ্বজিত তিনটে দিন আমাদের সাথে ছায়ার মতো লেগে ছিল। লঞ্চে উঠতেই জলখাবার – গরম লুচি-তরকারি, ডিম সেদ্ধ, কলা, সন্দেশ এর চা। আমাদের জন্য পুরো রান্না-বান্না লঞ্চেই হয়েছে তিন দিন। এমনকি রাতে রিসর্টে থাকলেও খাবার লঞ্চ থেকেই যেতো। এই নিমাই ছেলেটি কি পারে না! লঞ্চটা ওদেরই। ব্যবসার সাথে সাথে ও এখানের গাছপালা পশুপাখি এবং পর্যাবরণ সম্বন্ধে অনেক কিছু জানে। এবং পরিবেশ সচেতনতার গুণে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক সামাজিক কাজকর্ম করে।

এবার সুন্দরবনের সম্বন্ধে যা ভৌগোলিক তথ্য জানলাম এই ক’দিনে সেটা বলি। আমার অকপটে স্বীকার করতে কোন লজ্জা নেই যে এত কাছে থেকেও প্রায় কিছুই জানতাম না। এবং বেশীরভাগ লোক সুন্দরবন থেকে বেড়িয়ে ফিরে গিয়েও জানতে পারে না। সুন্দরবনের সব দ্বীপই ম্যানগ্রোভ জাতীয় সাছে ভর্তি। এরা নোনা জলে বাঁচতে পারে এবং এদের শিঁকড় অনেকটাই মাটির উপরে থাকে। এরাই মাটি কামড়ে থেকে জলের স্রোত আর ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে দ্বীপগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এখানে যেগুলোকে আমরা নদী ভাবি, তার কোনটাই নদী নয়। সবই খাঁড়ি বা ক্রিক। জল তুলে মুখে দিয়ে দেখেছি – স্বচ্ছ হলেও স্বাদ পুরীর সমুদ্রের জলের থেকে আলাদা নয়।

সুন্দরবনের মাত্র ৪০% ভারতে আর বেশীরভাগটাই বাংলাদেশে। ভারতের ভাগের আয়তন প্রায় ৪২০০ বর্গকিমি। প্রায় ১০০-টি দ্বীপ নিয়ে এই সুন্দরবন। তার মধ্যে ৪৮-টিতেই মানুষের বসবাস। বন্যপ্রাণী থাকার জায়গা আমরা অর্দ্ধেকটাই কেড়ে নিয়েছি। তাই একমাত্র এখানকার সব বাঘই মনুষ্যখাদক বা ম্যানইটার। ভারতের অন্যান্য অভয়ারন্যে যেমন খোলা জীপে দাঁড়িয়ে থেকে সামনে দিয়ে বাঘের ধীর পদক্ষেপে চলে যাওয়া দেখা যায়, এখানে সেটা সম্ভব নয়। ওনাকে কাছ থেকে দেখতে পাওয়া মানেই জীবনসংকট। ওদের জন্য হরিণ বা অন্য খাদ্যের যে বড়ই অভাব। তাই পেটের দায়ে ওরা নদী সাঁতরে নৌকোয় বা লোকালয়ে হানা দিতে বাধ্য হয়।

এই ৪২০০ বর্গকিমির ১৭০০ বর্গকিমি জুড়ে শুধুই খাঁড়ি, নালা, নদী। সবই নোনা জল। তাই অনেক গাছ ও প্রাণী অবলুপ্তির পথে। মিষ্টি জলেই তারা বেঁচে থাকতো আগে। যে সুন্দরী গাছের থেকে সুন্দরবনের নামকরণ, তাকেও আজ খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। কয়েক দশক আগেও এমন ছিল না। কারণ ভারতের দিকে মিষ্টি জল আসে শুধুমাত্র মাতলা নদী এর সামান্য কিছু গঙ্গা থেকে। কিন্তু ওপারে ইছামতী, মালঞ্চ, গড়াই (মধুমতী) নদী যথেষ্ট মিষ্টি জল বয়ে আনে। সপ্তদশ শতাব্দীতে সুন্দরবনের বিস্তার প্রায় এখনের কলকাতার কাছাকাছি পর্যন্ত্য ছিল। ইংরেজরাই তাদের জলপথে বানিজ্যের সুবিধার জন্য বাঁধ দিয়ে, খাল বা নালা কেটে মিষ্টি জলের প্রবাহ কমিয়ে দেয় এই পারে। ক্যানিংকে সাহেবের সময় বন্দর হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা আরো ক্ষতি করে। আর জনসংখ্যার চাপে মানুষ ক্রমশঃই জঙ্গল কেটে একের পর এক দ্বীপগুলি দখল করে।

এখন যেটুকু আছে, সেটা ইউনেসকোর সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত। একদম ভিতরে কোর এরিয়াতে মানুষের প্রবেশ নিষেধ। তার পার্শ্ববর্তী কিছুটা এলাকা বাফার এরিয়া। সেখানে পারমিট নিয়ে সীমিতসংখ্যায় লোক নৌকো নিয়ে যেতে পারে। তবে জঙ্গলে যাওয়া নিষিদ্ধ।

 

School children waiting for to go boat to school

ধূর্জটি আর নিমাইয়ের থেকে এই রকম নানা তথ্যপূর্ণ গল্প শুনতে শুনতে আর জঙ্গল, পাখি দেখতে দেখতে সন্ধ্যা পার হয়ে গেল। তার আগে দুপুরে একটা গ্রামের ঘাটে নেমেছিলাম। সেখানে ‘ইয়াস’-এ ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামটিতে সামান্য কিছু সাহায্য পাবার পর কি পরিবর্তন হয়েছে দেখতে। জলের তোড়ে মাটির বাঁধ ভেঙ্গে গ্রামের পুকুরগুলো এর চাষের জমিতে নোনা জল ভরে গেছিল। বাঁধ পরে গ্রামের লোকেরাই মেরামত করেছে। এখানের সামান্য যা জমি আছে সবই একফসলা। প্রধানতঃ ধান চাষ হয়। আর ছোট ছোট পুকুরগুলোতে মাছ চাষ করে কোনমতে এদের সংসার চলে। ধান ও মাছ দুয়ের জন্যই মিষ্টি জল দরকার যা আসে বৃষ্টি থেকে। কয়েক মাস আগে এদের কিছু সাহায্য করা হয়েছিল নোনা জল বের করার পর চুন আর ব্লিচিং দিয়ে লবনত্ব কমানোর জন্য। এখন পুকুরে জল দেখলাম। ওরা বলল মাছের চারা ছেড়েছিল কিন্তু লবনাক্ত জলের জন্য টিকে থাকতে পারে নি। কমপক্ষে এক বছর না গেলে ওই পুকুরে মাছ হবে না। ধানও তাই। দেখলাম মুর্গী পুষেছে। জিজ্ঞেস করা হলো ওদের যদি কিছু হাঁসের বাচ্চা দিই ওরা নেবে কি না। পুকুরে অনায়াসে থাকতে পারবে ভেবে। কিন্তু ওরা বলল নেবে না কারণ হাঁসের খাবার কেনার মতো পয়সা ওদের নেই। কিছু শীতের কম্বল দিয়ে সে গ্রাম থেকে বিদায় নিলাম।

সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ রিসর্টে গিয়ে জামাকাপড় বদলে বাইরে এসেই শুনি আমাদের জন্য স্থানীয় একটা যাত্রাদল বনবিবির পালা অভিনয় করবে। পেঁয়াজি আর চা খেতে খেতে ওদের ঝকমকে ক্যালাইডোস্কোপিক লাইট এবং গ্রীন রুম কাপড়ে ঘেরার কাজ শেষ। তিনজন বাজনাদারও তৈরী। ন’জন অভিনেতা অভিনেত্রী মিলে দেড় ঘন্টা ধরে দক্ষিনরায় আর বনবিবির পালা দেখলাম। গানে ভরা, মন ছুঁয়ে যাওয়া অভিনয়। এখানের লোক বাঘকে দক্ষিনরায় চরিত্রের সাথে এক করে দেখে। এমনকি ‘বাঘ’ শব্দটা নিতান্ত প্রয়োজন না হলে উচ্চারণও করে না। এরা বিশ্বাস করে বনবিবির পূজো করলে দেবীই বাঘের হাত থেকে রক্ষা করবেন। যাত্রার পালা শেষ হলে আমাদের অবাক হবার পালা। ১৩ জন লোক, এত পোষাক, সাজগোজ, বাজনা, লাইট, টোটো ভাড়া – সব মিলিয়ে ওদের চাহিদা মাত্র ২০০০ টাকা! শহরে তো লাইট আর পোষাকের ভাড়াতেই ওই টাকা লেগে যাবে। ভাবতে লাগলাম কতটা গরীব হলে লোকের চাওয়াটা এত কমে যায়? কিছু টাকা বেশী দেবার পর ওদের মুখে এত কষ্টেও মুহূর্তের যে আনন্দ ধরা দিল সেটা পেয়েই আমরা ধন্য হলাম।

Artists of "Banbibi" jatra pala

পরদিন সকাল ন’টার মধ্যে আবার লঞ্চে প্রত্যাবর্তন। এবং নিমাইয়ের আতিথ্যে সুস্বাদু জলখাবার জলপথে যেতে যেতে। আর না চাইতেই চা সারাদিনের আড্ডার সঙ্গী ছিল। একটু গিয়ে বনদপ্তর থেকে আমাদের ও লঞ্চের পারমিট করা হলো। তেমন কোন গন্তব্য ঠিক করা ছিল না। যেহেতু সুন্দরবন বেড়াতে আসা লোকেদের মধ্যে গড়ে ২৫ জনের মধ্যে একজনেরও বাঘ দেখার সৌভাগ্য হয় কি না জানা নেই, তাই আমরা ঠিক করলাম আমরা গাছ ও পাখি দেখার ও চেনার চেষ্টা করবো। লঞ্চে ওঠার সময় কাদায় চরে বেড়ানো ছোট ছোট মাড ক্রিপার (এক জাতীয় মাছ) দেখেছি। বাটাং গাছ চিনলাম। এটা দু’রকমের হয় – পেয়ারা বাটাং (ডালগুলো পেয়ারা ডালের মত) আর কালো বাটাং। এ ছাড়াও নৌকো থেকে বাইন, গোলপাতা, বুনো ধুঁধুল (গোল বেলের মত ফল ঝুলে ছিল), কাঁকড়া, হেতাল, গরান, কেওড়া, ইত্যাদি দেখা হলো। দু’চারটে সুন্দরী গাছও নিমাইয়ের চোখ এড়ায় নি। পাখিও অনেক দেখা গেল। সব নাম মনে নেই। যা মনে আসছে সেগুলো হলো মাছরাঙ্গা, পানকৌড়ি, লেসার হুইস্লিং ডাক, নীলকন্ঠ, কাঠঠোকরা, ফিঙে, বাটান, দাঁড়কাক, বক, সারস, বনমোরগ, ইত্যাদি। এছাড়াও দেখেছি অনেক চিতল হরিণ বা স্পটেড ডিয়ার। শেষ দুপুরে বেশ বড়-সড় এক কুমির বাবাজী দর্শন দিলেন। চওড়া চরে দিবানিদ্রায় মগ্ন অবস্থাতেই ছিলেন। আমাদের পাত্তা দেবার প্রয়োজন মনে করেন নি তিনি। আর একটু এগিয়ে দোবাঙ্কি ফরেস্ট ক্যাম্পে নামলাম। সিঁড়ি দিয়ে একটু উঠে জালে ঘেরা পথে উপর থেকে হেঁটে দেখার জন্য পিলারের উপর দিয়ে প্রায় ৫০০ মি গেলাম। এক জায়গায় একটা বেশ বড় বৃষ্টির মিষ্টি জলে ভরা জলাশয় ঘিরে প্রচুর পরিযায়ী পাখি একপায়ে দাঁড়িয়ে ঘাড়ের পিছনে মুখ গুঁজে বিশ্রাম নিচ্ছিল। তাদেরই মাঝে হরিণভায়াদের নিঃশব্দে জল খেতে দেখলাম। ব্যাঘ্র মহাশয় তো দর্শন দিলেন না, তবে তিনি আড়াল থেকে আমাদের লক্ষ্য করছিলেন কি না বলতে পারবো না। এদিন পূর্ণিমা ছিল। লঞ্চ থেকে চন্দ্রোদয় দেখলাম। অন্ধকারে জলের উপর চাঁদের রূপোলি আলোর ঝিকিমিকি দেখে এক নৈসর্গিক অনুভূতি হলো।  

 

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ রিসর্টে ফিরে দেখি আর এক চমক অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। ডাইনিং হলে দেখলাম এক মাঝবয়সী স্থানীয় ভদ্রলোক মাফলার দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে বসে আছেন। সবাই জড়ো হবার পর উনি মাফলার খুললেন। নাকের পাশ থেকে ঘাড়ের পিছন পর্য্যন্ত গভীর ক্ষতের দাগ। নাম তপন দাস। বাঘের সাথে পাল্লা দিয়ে লড়ে জয়ী হয়েছিলেন বছর কয়েক আগে। ওনার মুখ থেকে সেই হাড় হিম করা কাহিনী শুনবার সৌভাগ্য হলো। সংক্ষেপে ঘটনাটা এইরকম। ওনারা ৪ জন শেষ রাতে সরু খাঁড়িতে মাছ ধরার পর জাল টাঙ্গানো লাঠি তুলতে ব্যস্ত। এমন সময় হঠাৎ বাঘের শব্দ শুনতে পান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাঘ নৌকোর উপর ঝাঁপ মারে। উনি বুদ্ধিভ্রষ্ট না হয়ে ইচ্ছাকৃত ভাবে চিৎ হয়ে জলে পড়ে যান যাতে বাঘ বেশি সুবিধা না করতে পারে। তবু সে তপনবাবুর ঘাড় কামড়ে ধরে এবং ধ্বস্তাধ্বস্তি চলে। অন্য মাঝিদের একজন অজ্ঞান হয়ে যায় আর বাকি দু’জন বৈঠা দিয়ে বাঘের সাথে লড়তে থাকে। বাঘ বেগতিক দেখে মুখের গ্রাস ফেলে পালায়। ওনার একপাশের চোয়াল ঝুলে পড়ে। রক্তাক্ত অবস্থায় ক্ষত জায়গায় গামছা বেঁধে কাছের ফরেস্ট বীট অফিসে যান ওনারা। তারা আগে দেখতে যায় মাঝিরা বাঘের কোন ক্ষতি করেছে কি না। রেডিও কলার লাগানো বাঘদের গতিবিধি দেখে ওরা বোঝে যে বাঘ অক্ষত আছে। তারপর নৌকোয় গোসাবা হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা শুরু হয়। ততক্ষণে ১০ ঘন্টার বেশি সময় পার হয়ে গেছে। ১৬ দিন গোসাবা, এবং তারপর ৩ মাস কলকাতায় থেকে, অপারেশন আর প্লাস্টিক সার্জারি করে কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে তপনবাবু জীবন ফিরে পান। এখন উনি ফুচকার ব্যবসা করেন। বাঘ দেখার চেয়ে সেই লড়াইয়ের ঘটনা শোনা কোন অংশে কম রোমাঞ্চকর নয়।

এবার এখানকার মানুষ ও জনজীবন সম্বন্ধে যা জানতে পারলাম তার কিছুটা বলি। প্রাচীনকালের (১৮০০ বছর আগে) লোকবসতির কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছিল। আকবরের সময় মোঘল সেনার আক্রমনে বাংলার রাজা প্রতাপাদিত্য রায়ের সেনা ও প্রজারা পালিয়ে এদিকে আসে। পরে পোর্তুগীজ ও আরাকান বা মগরাও তাদের আক্রমন এবং লুঠতরাজ করে। তবে এখন থেকে ৭০-৮০ বছর আগে সুন্দরবনে কোন মানুষেরই পাকাপাকি বাস ছিল না। পুরানো দিনে, মেদিনীপুর থেকে কিছু জমিদার নৌকোতে লোক নিয়ে ধানের বীজ ছড়িয়ে যেতেন, ৩-৪ মাস পরে এসে ফসল তুলে নিতেন। স্বাধীনতার পর থেকে জনসংখ্যার চাপে মানুষ এক এক করে দ্বীপ দখল করতে শুরু করে। সত্তরের দশকে পূর্ববঙ্গের অনেক শরনার্থীদের বলপূর্বক বাসের অযোগ্য মরিচঝাঁপি দ্বীপে পাঠানো হয়, তবে এখন সেটাতে কেউ থাকে না। এখানকার বেশিরভাগ লোকেরই আদি বাসস্থান ছিল পূর্বে মেদিনীপুর বা পশ্চিমে যশোর জেলায়। তবে কিছু উত্তরবঙ্গীয় রাজবংশীদের উত্তরসূরীও দেখা যায়। সুন্দরবনের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৪৫ লক্ষ। এদের মধ্যে বেশিই হিন্দু, ৮৫% এর উপরে। ৭০% এর বেশি এসসি/এসটি। একটা অনন্য সামাজিক প্রথা আছে এখানে – হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে একসাথে এরা বনবিবির পূজো করে।

এখানের মানুষের জীবনযাত্রা খুবই কঠিন। প্রতিনিয়ত এঁরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে আছেন। প্রধান জীবিকা – জলে মাছ ও কাঁকড়া ধরা, জঙ্গলে মধু ও মোম সংগ্রহ করা। খাঁড়িতে মাছ ধরতে ১ বছরের পারমিটের খরচ ৪০,০০০ টাকা। বেশির ভাগ লোকেরই সে ক্ষমতা নেই। তাই রাতের বেলা চোরা পথেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এরা বার হয়। প্রতিটি গ্রামেই কয়েকটা পরিবার পাওয়া যাবে যাদের মধ্যে কেউ না কেউ বাঘের থাবায় প্রাণ দিয়েছেন নয় তপনবাবুর মত ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছেন। সরকারীভাবে খুব কম খবরই বাইরে যায়। তপনবাবুর কথায় প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫টা বাঘে আক্রমনের ঘটনা ঘটে পুরো সুন্দরবনে। যেহেতু বিনা পারমিটে ধরা পড়লে বা বাঘের ক্ষতি হলে এদের পুরো পরিবারকে নিয়ে টানাটানি হয়, তাই এমনও হয় যে মৃত ব্যক্তির দেহ তার আত্মীয়রাই কেটে টুকরো টুকরো করে জলে ভাসিয়ে দেয়। ভাবলেও গা শিউরে ওঠে!

মাছ-মধু ছাড়াও পুকুরের মিষ্টি জলে মাছ চাষ, একফসলা ধান এবং সব্জি চাষ করে গ্রামের লোক। কিন্তু তাতে বড় বাধা বন্যা, ঝড়ে বাঁধ ভেঙ্গে নোনা জল ঢুকে যাওয়া। একবার নোনা জল ঢুকলে এক বছরের বেশি সময়ের জন্য পুকুর আর ক্ষেত মাছ বা ফসল চাষের অযোগ্য হয়ে যায়। তখন সকলে বাধ্য হয় অবৈধভাবে জলে-জঙ্গলে যেতে। কিছু কিছু যুবক তাই পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে পশ্চিমবঙ্গের অন্য জেলায় বা দেশের অন্য রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে। স্বাস্থ্য পরিষেবার এখানে অত্যন্ত অভাব। সেই গোসাবা ছাড়া কাছাকাছি কোনও হাসপাতাল নেই। গোসাবা আর ক্যানিংই এদের সব পন্য কেনা-বেচার জায়গা। মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, দক্ষিন ২৪ পরগনার সদর বা জেলার অফিস-কাছারী সেই কলকাতার আলিপুরে কেন? 

Late afternoon siesta on the river bank
Everybody likes sweet water

তৃতীয় দিনে আমরা সকালে গ্রামে হেঁটে বেড়ালাম। বাঁধের কাজ হচ্ছে দেখলাম। তবে মাটি দিয়ে। প্রতি বছরই এরা গড়ে। প্রকৃতি ভেঙ্গে দেয়। আর এক জায়গায় নৌকা তৈরি করতে দেখলাম। জানলাম প্রায় ৪০ ফুটের নৌকা বানাতে দুজনের ৪-৫ মাস সময় লাগবে। খরচ ২ লক্ষ টাকার বেশি। ফিরে রিসর্ট ছেড়ে জিনিষপত্র নিয়ে ১০টায় লঞ্চে উঠলাম। সারাদিন আবার জলে ঘুরে অনেক রকম পাখি দেখলাম। লাল-সাদা ইউনিফর্ম পরে স্কুলের ছেলে-মেয়েদের দ্বীপের ঘাটে খেয়ার অপেক্ষায় থাকতে দেখলাম। ধূর্জটি জানালো এখানে দুটো জিনিষ খুব ভালো – প্রচুর স্কুল আছে, আর প্রতিটা গ্রামে বিদ্যুত পৌঁছেছে। কিন্তু চারিদিকে এত জল, তবু মানুষের পানীয় জলের বড়ই অভাব। নোনা জলের স্তর অনেক নীচ পর্য্যন্ত গেছে। তাই ১১০০ ফুট বোরিং করে তবে খাবার জল পাওয়া যায়। তবুও আশ্চর্যের বিষয়, এখানে আন্ত্রিক রোগ খুব বিরল। আর পুরো সুন্দরবনে কোরোনা আক্রান্ত হয়ে একজনও মারা যান নি এ পর্য্যন্ত। আর একটা কথা এখানে না লিখলেই নয়। আমাদের থেকে কিছুটা দূরে একটা লঞ্চ থেকে কেউ একটা প্লাস্টিকের বোতল জলে ফেলে দিতে দেখলাম। আমরা কিছু বলার আগেই নিমাই লঞ্চ ঘুরিয়ে নিয়ে জল থেকে বোতলটা তুলে আনলো। এটাই ওর থেকে শিক্ষা নেবার বিষয়। সুন্দরবনে বেড়াতে আসা ট্যুরিস্টরা কোনদিন কি আগে এই শিক্ষা নিয়ে তবে বেড়াতে আসবে?   

বিকেল সাড়ে চারটেয় গোসাবা পৌঁছে নিমাইদের কাছ থেকে বিদায় নিতে হলো। এই অসম্ভব প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও স্থানীয় বাসিন্দারা কি করে দিন কাটাচ্ছেন সেটা জানাই সুন্দরবনে এসে সব চেয়ে বড় পাওয়া। এটাই সুন্দরবনের সৌন্দর্য্য। গাড়িতে যেতে যেতে ভাবছিলাম, সুন্দরবনে প্রায় ২০০০ কিমি নদীতট। কোন ভাবেই সেটা পুরো কংক্রিটে বাঁধানো আর্থিকভাবে সম্ভব নয়। ওই মানুষগুলোকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া বা রিসার্চ করে অল্প খরচে পরিবেশ-বান্ধব অন্য কোন বিকল্প বের করা কি একেবারেই অসম্ভব? কলকাতা শহর সমুদ্রতল থেকে মাত্র ৯ মিটার উঁচু। বিশ্ব ঊষ্ণায়ণের প্রভাবে সুন্দরবন যদি ডুবে যায়, আমরাই কি তলিয়ে যাবার থেকে বেশিদিন বাঁচতে পারবো? সুন্দরবনের অস্তিত্ব কি করে রক্ষা করা যায়, আমাদের সকলেরই সেটা ভাববার সময় এসেছে।

অপূর্ব কর

২৬/১২/২০২১

সুন্দরবন ভ্রমণের আরও কিছু ছবি …

0 0 votes
Rate this article
Facebook
Twitter
LinkedIn
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
Categories
Recent Topics
Sundarbans
সুন্দরবনের সৌন্দর্য্য
গত দুই বছর কোরোনার ভয়ে কোথাও না যেতে পেরে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। মাসখানেক আগে...
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x