House Of Soul

Reg. No: S0018301 of 2021-2022

+91 9674173922

hos.kol2021@gmail.com

A-81, New Raipur Road

Kolkata 700 084

Blog

স্বেচ্ছাবন্দির নামচা (প্রথম পর্ব)

আজ পুরোনো ডায়েরির পাতা উল্টে বার করে আনলাম "House of Soul"এর জন্য আমার প্রথম নিবেদন।লকডাউন শুরুর একদম প্রথমদিকে গৃহবন্দী অবস্থায় বন্দিদশা কাটাবার উপায় হিসেবে কলম তুলে নিয়েছিলাম, আর তারই ফলশ্রুতি এই জঙ্গলের আখ্যান।

দেবজিত দাস

 

নিশি চাঁদ ডাক দিলো পালামৌর জঙ্গলে

আজ পুরোনো ডায়েরির পাতা উল্টে বার করে আনলাম “House of Soul”এর জন্য আমার  প্রথম নিবেদন।লকডাউন শুরুর একদম প্রথমদিকে গৃহবন্দী অবস্থায় বন্দিদশা কাটাবার উপায় হিসেবে কলম তুলে নিয়েছিলাম, আর তারই ফলশ্রুতি এই জঙ্গলের আখ্যান।এক কিস্তিতে এ ঘোরাঘুরির গল্প শেষ করা যাবে না, আর বহুদিনের বিবর্ণ হয়ে যাওয়া স্মৃতির অনেক ছবিই আজ আর আস্ত নেই, তাই বেশ কিছু ছবিই ধার করতে হলো বেশ কিছু আন্তর্জাল থেকে। 

          জঙ্গল আমায় টানে,বন্যেরা বনে সুন্দর-এই কারণেই বোধহয় কিছুটা বন্যতা আমার মধ্যে আজও আছে।জঙ্গলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়, যতদূর মনে পরে ১৯৮০ সালে, পাড়ার রকের আর খেলার মাঠের বন্ধুদের সঙ্গে বেতলা নেতারহাট বেড়াতে যাওয়া।তখনও পৃথিবীটা ছোট হতে হতে বোকা বাক্সে বন্দি হয়নি, আন্তর্জাল কি বস্তু, তার কাজ কর্ম অন্তত ভারতবর্ষের লোকের কাছে সেভাবে পরিচিতি পায়নি।নিজের পকেটের সম্বল সামান্য রেস্ত আর পাঁচজন বন্ধু মিলে চড়ে বসেছিলাম বর্ধমান থেকে দুর্গাপুরের বাসে।আজকের দুর্গাপুরের সঙ্গে তখনকার শিল্প শহরকে মিলিয়ে দিলে অবাস্তব হবে।কিছুই জানি না, চিনি না, বাস নামিয়ে দিলো একটা চৌমাথায়- লোককে জিজ্ঞেস করে জানলাম এটা গান্ধী মোড়।যা: বাবা, আমরা তো উঠবো রাঁচি যাওয়ার কালিকা বাসে, সেটা কোথা থেকে ছাড়ে? তারও উত্তর পাওয়া গেলো এক পান দোকানদার এর কাছে, যেতে হবে ভিড়িঙ্গি মোড়।আমাদের কাছে তখন সবই হিব্রু, কিন্তু যাবো কিভাবে? ছজন সদ্যযুবা চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে লরি, টেম্পো যাকেই হাত দেখাই কেউ দাঁড়ায় না, কোনো বাসেরও দেখা নেই।এদিকে কালিকা ছাড়ার সময় এগিয়ে আসছে।উত্তেজনা আর ভয়, দুটো অনুভূতি একসাথে, কিন্তু কিছুই করার ছিল না তখন।ভগবান বোধহয় আমাদের দুর্দশায় সত্যি বিব্রত হয়েছিলেন, না হলে হঠাৎ উদয় হওয়া একটা সাদা অ্যাম্বাসেডরকে হাত দেখাতেই কেন সেটা দাঁড়িয়ে পড়বে? আজও সেই বয়স্ক ভদ্রলোকের মুখ মনে পড়ে, সহাস্য মুখে প্রশ্ন ছিল “কোথায় যাবে ইয়ং ম্যান রা”? ঠেসে ঠেসে ছজন উঠেছিলাম ওনার গাড়িতে- আজ এই শরীরে বোধহয় কিছুতেই পারবো না।ভিড়িঙ্গি পৌঁছে কালিকা এক্সপ্রেসে উঠে তো পড়লাম, সে বাস আজও রাঁচি যায়।জানি না তার কোনো উন্নতি হয়েছে কিনা, তবে আমাদের পকেটের রেস্ত অনুযায়ী সেই তখন আমাদের কাছে স্বর্গ।

কালিকা বাস

বাস চলছিল আপন গতিতে, চটুল হিন্দি গান আর বন্ধুদের সাথে ঠাট্টা তামাশায় দাঁড়িয়ে থাকার যন্ত্রনা বা পায়ের শিরায় টান (আজকের মতো) কোনোটাই অনুভব করছিলাম না।হঠাৎ মেজাজ হারালাম, পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ একজন আমার বেড়াতে যাওয়ার জন্য কদিন আগে কেনা নতুন জামাটা ছিঁড়ে দিলো।ফর ফর আওয়াজটা কানে আসতেই পেছন ঘুরেছিলাম, দেখলাম একজনের বত্রিশ বার করা অট্টহাসি।বুঝুন আমার অবস্থাটা- ছেঁড়া জামা নিয়ে এতটা রাস্তা কিভাবে যাবো, আর অপকর্মটি যিনি করলেন তিনি কিনা !!!!!!! কিন্তু কি আশ্চর্য্য, চারিদিকে তাকিয়ে দেখি সবাই হাসছে, মায় আমার বন্ধুরা পর্যন্ত।অজান্তে হাতটা পিঠে চলে গিয়েছিলো,  দেখলাম জামা আস্তই আছে। আজও কালিকার সেই বাস কন্ডাকটর এর কথা মনে পড়ে, মুখ দিয়ে ভয়ঙ্কর আওয়াজ করে লোককে বিব্রত করে নির্ভেজাল মজা নেওয়া, আর কষ্টকর যাত্রায় সবাইকে আনন্দ দেওয়ার প্রচেষ্টা- সব মিলিয়ে একটা ছোটোখাটো হিউমার প্যাকেজ।    

ধানবাদ ছাড়িয়ে রাঁচির পথে

দীর্ঘ ছ-সাত ঘন্টার ক্লান্তিকর সফরের পর শরীরটা তো রাঁচি পৌঁছলো, হাত পা বোধহয় আর শরীরের সাথে লেগে থাকার তাগিদ অনুভব করছিলো না।কিন্তু পকেট তো পরিশ্রম আর শরীরী অসহায়তার মূল্য বোঝে না।বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম ৪৮০ টাকা পকেটে নিয়ে, তার কিছুটা বাসভাড়ায় গেছে।রাঁচিতে থাকার রেস্ত নেই, আজই পৌঁছাতে হবে পালামৌ এর জঙ্গলে।খোঁজ খোঁজ, সবাই মিলে চষে ফেললাম বাসস্ট্যান্ড, মিললো এক ট্রেকার এর খোঁজ, দেহাতী আর স্থানীয় মানুষজন নিয়ে সে তখন ফুঁসছে শেষ সন্ধ্যার দৌড় শুরু করার জন্য।ব্যাগপত্তর নিয়ে ছজন উঠে তো পড়লাম, ছোটবেলায় পড়েছিলাম “তিল ধারণের স্থান হয়তো আছে, কিন্তু মনুষ্য ধারণের স্থান বিন্দুমাত্র নাই”- ট্রেকার এর ভিতরের বাস্তব চরিত্র বোধহয় এর থেকেও খারাপ ছিল। যাদের ট্রেকার এ যাতায়াতের সামান্য অভিজ্ঞতা আছে, তারা বুঝবেন অন্ধকার জঙ্গলের রাস্তায় মুড়ির টিনের মতো ঝাঁকি খেতে খেতে, সে এক বিভীষিকার যাত্রা।চারিদিক নিঃস্তব্ধ, মুড়ির টিন ছুটছে, স্থানীয়রা টুকটাক কথাবার্তা চালাচ্ছে, আমাদের অবস্থা কহতব্য নয়, মুখ খোলার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই।   

 

ডাল্টনগঞ্জ থেকে বেতলার রাস্তায়

প্রায় ১৫০ কিলোমিটার রাস্তা পার করে যখন বেতলায় পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে গেছে, তবে জঙ্গলের ভাষায় নিশুতি রাত।আগেই বলেছি তখন আন্তর্জাল পরিষেবার এতো রমরমা নেই, আর বেতলায় দূরভাষও বিরল।কিন্তু ভগবান বোধহয় অসহায়দের উপর সদয় হন একটু বেশি করেই, স্থানীয় একজন একটা ছোট্ট হোটেল দেখিয়ে দিল- ” শায়েদ খালি হায়”, এই এক লাইনই তখন আমাদের আশার আলো।হোটেল মধুবন, আজও নামটা মনে আছে- চাবি হাতে একজন মধ্যবয়স্ক কোথা থেকে উদয় হলো কে জানে। “একহি রুম মিল সকতা হ্যায়, চার আদমি শো সকতা হ্যায়”- ধুৎ তেরি তোর চার আদমি, আমরা তখন মাটিতে শুতেও রাজি, শুধু একটা ছাদ আর জন্তুজানোয়ারের উপদ্রব আটকানোর জন্য একটা শক্ত দরজা।দৈনিক ভাড়া ৩৫ টাকা, সেও তখন আমাদের কাছে অনেক, আজ বোধহয় সে মধুবনের অস্তিত্বও নেই।

জঙ্গলে ঢোকার মুখে

কিন্তু বিপদের কি শেষ আছে, ব্যাগপত্তর মেঝেতে রাখতে না রাখতেই দুমদাম বাজি পটকার আওয়াজ।সময়টা বোধহয় অক্টোবর এর শেষেই হবে, ভাবলাম আগাম দীপাবলির মহড়া চলছে।ভুল ভাঙলো মানুষের চিৎকারে, “হাথি আয়া রে”!!! হলোটা কি, দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই আরেক বিপদ।পাশের ঘরে যে আরেক নবদম্পতি ছিলেন তারাও তড়িঘড়ি বাইরের দরজা খুলে- নাঃ ভদ্রমহিলা বেরোতে পারেননি।দরজার উচ্চতা সত্যিই ছোট, অন্ধকারে ঠাহর করতে না পেরে, জোর ধাক্কা- আর প্রপাত ধরণীতলে।অত রাতে কপালে রক্তপাত, যদিও যৎসামান্য, কিন্তু কিছু তো একটা করতে হয়।“কারো কাছে কিছু কি আছে”-ভাগ্যিস একটা বোরোলিনের টিউব সঙ্গে ছিল।যাই হোক, অনেক রাত হয়েছিল শুতে, ঘুমের দেশে যাওয়ার তাড়া ছিল, পরদিন খুব ভোরে উঠে বেরোবার পরিকল্পনা রাতেই হয়ে গেছিল।

         সকাল সকাল পৌঁছে গেছিলাম জোড়া দুর্গে।স্থানীয়রা একে মেদিনী রায়ের গড় বলে।চেরো বংশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজা ইনি, যদিও সবাই বলে তেকোণা পাহাড়ের উপর নতুন দুর্গটা ওনার ছেলে প্রতাপ রায়ের তৈরী। 

মেদিনী রায়ের গড়

পুরোনো দুর্গের ঢোকার মুখেই একটা সুড়ঙ্গ, বোধহয় পালাবার রাস্তা, বিপদের দামামা বাজলেই- রাজা যঃ পলায়তি সঃ জীবতি।দুর্গের মাঝখানে এক বিশাল কুয়োর কথা আজও মনে আছে, এতো গভীর থেকে জল তুলতো কিভাবে কে জানে।নতুন দুর্গে পৌঁছানোটা বেশ কষ্টকর, কিন্তু ঢোকার মুখের তোরণে তখনও দেবনাগরী লিপিতে লেখাগুলো একদম স্পষ্ট।জঙ্গলে ভরা দুর্গে বেশি কিছু দেখার সুযোগও ছিল না, আর সূর্যিমামা ঠারে ঠারে জানান দিচ্ছিলো যে তার তেজ সে বাড়িয়েই যাবে।দুপুরে হোটেলে ফিরে পেলাম চাউল আর সবজি, ভাববেন না সবজি তে সবুজ এর লেশমাত্র ছিল, শুধু খোসা সুদ্ধু আলুর তরকারি- সেই তখন অমৃত।কারণ তখন উত্তেজনা, নিশি অভিযানের- সন্ধ্যেবেলা আমরা ঢুকবো অন্ধকারের ভিতর, জঙ্গল তখন আমায় টানছে-“চাঁদ তুমি কখন উঠবে”?

                  এ পর্বের দৈর্ঘ্য অনেকটাই হয়ে গেলো, তাই আজ এখানেই শেষ,পরের পর্বে আবার ফিরবো জঙ্গলের আঁধার, জোনাকির আলো আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক নিয়ে।

                                                                                      (চলবে)

4 1 vote
Rate this article
Facebook
Twitter
LinkedIn
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
Categories
Recent Topics
Picture1
স্বেচ্ছাবন্দির নামচা (প্রথম পর্ব)
আজ পুরোনো ডায়েরির পাতা উল্টে বার করে আনলাম "House of Soul"এর জন্য আমার...
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x