House Of Soul

Reg. No: S0018301 of 2021-2022

+91 9674173922

hos.kol2021@gmail.com

A-81, New Raipur Road

Kolkata 700 084

Blog

স্বেচ্ছাবন্দির নামচা (দ্বিতীয় পর্ব)

মেদিনী রায়ের গড় দেখে ফিরে দুপুরের একটা ছোট্ট ভাতঘুমের পর বেলা পড়তেই বিকেল বিকেল চারপাশটা একটু ঘোরার নেশায় হাঁটা দিয়েছিলাম।সবুজের প্রতি আমার এই আকর্ষণ বা মোহ যাই বলুন, বোধহয় আমার জঙ্গলপ্রেমের উৎস।

দেবজিত দাস

 

স্বপ্নে দেখা কোয়েল লুকোয় শাল পিয়ালের দেশে 

মেদিনী রায়ের গড় দেখে ফিরে দুপুরের একটা ছোট্ট ভাতঘুমের পর বেলা পড়তেই বিকেল বিকেল চারপাশটা একটু ঘোরার নেশায় হাঁটা দিয়েছিলাম।সবুজের প্রতি আমার এই আকর্ষণ বা মোহ যাই বলুন, বোধহয় আমার জঙ্গলপ্রেমের উৎস।বুদ্ধদেব গুহর একনিষ্ঠ পাঠক আমি- মাধুকরী, কোয়েলের কাছে, সবিনয়ে নিবেদন- আমার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে।স্বপ্নে কতদিন যে পৃথুর মতো গভীর জঙ্গলে জীপ্ নিয়ে অচেনা গহীন পথে ছুটে বেড়িয়েছি, রোমান্টিসিজম এর অলীক কল্পনা আর কি!বেতলার পঞ্চায়েত ক্যান্টিনটা সামনে পড়তেই,কিসের আশায় ভিতরে ঢুকেছিলাম এখন মনে নেই।তবে লাভ যে হলো সেটা বলাই বাহুল্য, রাতের দানাপানির ব্যবস্থা এরাই করে দেওয়ার আশ্বাস দিলো।হাতে গড়া রুটি, দেশি মুরগি আর কাঁচা পেয়াঁজ, জঙ্গলের নিশিভোজন- রাতে যে জমবে তাতে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না।একটু এগোতেই- চোখে ভুল দেখছি না তো, এটা গাছ না বাড়ি ? নাঃ, গাছের উপর বাড়ি, জীবনের প্রথম দেখা এবং পড়া অরণ্যদেবের সব তাহলে সত্যি-এরপর হয়তো খুলিগুহা !!    

গাছ বাড়ি

কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই এক নিভৃত আসরের দরজা খুলে গেলো।সুন্দর সাজানো গোছানো, কি নেই বাড়িতে- আহা, একদিন যদি এখানে থাকা যেত, রেস্ত যে বাদ সাধে।

              সূর্য ডুবে গেছে, চাঁদ উঁকি দিচ্ছে আকাশে, আর আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছি জীবনের প্রথম অরণ্যসফরের।গাঢ় পোশাক পড়া যাবে না, টর্চ্লাইট্ যেন সঙ্গে থাকে, বেতালের ফিসফিস কুঞ্জের মতো কথার আদানপ্রদান হবে- আরও কত আলোচনা, সব কি আর মনে থাকে।সন্ধ্যে তখন সাতটার আশেপাশে, জলপাই সবুজ জীপটা সামনে এসে দাঁড়াতেই, শরীর আর মনে একসাথে এক অজানা আনন্দ আর শঙ্কা- জীপ্ এর পিছনে উঠে তো বসলাম, বা দাঁড়িয়েই রইলাম বলতে পারেন- বন্যপ্রাণী একটাও আমার চোখের দৃষ্টি হারিয়ে লুকিয়ে যেতে পারবে না।জীপ্ এর সামনে ড্রাইভার আর ফরেস্ট গাইড, পিছনে আমরা, জীপ্ পাথুরে মাটির রাস্তা ধরে জঙ্গলের গেটে পৌঁছালো- কাগজপত্র দেখার পর, শুরু হলো নেশাতুর আমার জঙ্গলসুন্দরীর সাথে জীবনের প্রথম দেখা।    

জঙ্গলে ঢোকার গেট

কিন্তু এ কী দৃশ্য খুলছে আমার চোখের সামনে, গহন জঙ্গলের অন্ধকার কোথায়? চারদিকে ছোট ছোট সবুজ টুনিবাল্ব জ্বলছে কেন, দ্বীপাবলি  কি জঙ্গলেও লাগলো নাকি? ছোটবেলা থেকে কাঁচের বোয়মে জোনাকি ধরার দিনগুলো যে এভাবে ফেরৎ আসবে কখনো ভাবিনি আমি।সবুজ আলো জ্বলছে নিভছে, মায়াবী সেই সন্ধ্যে- থুড়ি, জঙ্গলের রাত, আজ বন্যপ্রাণীদের আমার দৃষ্টি থেকে রেহাই নেই।যত ভিতরে ঢুকছি আওয়াজটা ততই বাড়ছে, কর্কশ আওয়াজটা এতো জোরদার কেন? ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক এতো অদ্ভুত, কি-রি-রি থেকে ক্যারাও ক্যারাও হয়ে জঙ্গলে ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।যদিও বর্ণনাটা একটু ক্লিশে হয়ে গেলো, তবুও জঙ্গলের মৃদুমন্দ আলো আর হয়তো বা কিছুটা শ্রুতিকটুতা ধরে রেখে এই ছোট্ট প্রাণীগুলো রহস্যের জাল বিস্তার করেছে অনেকটাই বেশি করে।

      ওমা, হঠাৎ কি হলো, কিছুটা যাওয়ার পর জীপটা দাঁড়িয়ে পড়লো কেন ? ফরেস্টগার্ডের ইশারা আর জীপ্ এর হেডলাইটে যা দেখলাম, প্রথম দর্শনেই জঙ্গলের নেশা কাটানোর পক্ষে তা যথেষ্ট।একটা আধটা নয়,একপাল হাতি, রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে।গার্ডের বর্ণনায়, এটাই সেই হাতির পাল যারা কাল রাতে লোকালয়ে ঢুকেছিলো, পটকার আওয়াজে নিজের ডেরায় কিছুটা হলেও ফিরেছে।  

বুনো হাতির দল

উৎসুক আমি, বুদ্ধদেব গুহ পড়ে নিজেকে জঙ্গলের বিশারদ বলে ভাবতে শুরু করে দিয়েছি-জিজ্ঞেস করলাম, ক্ষুধার্ত হাতি নাকি ভয়ঙ্কর হয় আর খেদা পেলে নাকি প্রতিআক্রমণ করে।গার্ড বোধহয় এই অর্বাচীনের ঔৎসুক্যে আর বক্তৃতায় একটু বিরক্ত, সে তখন সম্ভাব্য বিপদের আঁচ করতে পারছে।জীপগাড়িতে এতো আলো লাগানো যায় জানা ছিল না আমার, ব্যাটারির এতো ক্ষমতা ? সমস্ত আলোর ছটা চোখে লাগার জন্য, নাকি পুরো একসিলেটরের চাপে জীপ্ এর অসহ্য গর্জন কানে নেওয়ার বিড়ম্বনা থেকে বাঁচার আশায়- তারা সরলেন, আমরা এগোলাম।জীপ্ ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে, দুপাশে শাল আর বাঁশগাছের জঙ্গল, মাঝেমাঝে কিছু মহুয়া গাছ, অদ্ভুত তার ফল।জীবনে এর পরেও বহু জঙ্গলে গিয়েছি- কিন্তু সেইসময়ের পালামৌ এর জঙ্গলের যে ঘনত্ব ছিল, তা কোথাও খুঁজে পাইনি।অস্ট্রেলিয়ান ঘাসের মতো লম্বা লম্বা শরবন্, পরে জেনেছিলাম ওটা খয়ের ঘাস, পালামৌ জঙ্গলের বৈশিষ্ট্য,আর জন্তুজানোয়ারদের আড়ালের হাতিয়ার।  

ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকার প্রচেষ্টা

বেতলার হরিণ নাকি জীপ্ এর সাথে দৌড়ায়, এটা গল্প নয় সত্যি,সেদিনই দেখলাম।একটা বাঁক ঘুরতেই দেখেছিলাম তাকে, নিশ্চিন্তে গাছের পাশে দাঁড়িয়ে, কালো খোদাই করা চেহারা, লাল চোখের শাসানি- জঙ্গলের বাইসন, বাঘের থেকেও ভয়ঙ্কর।বাঘের কথায় মনে পড়ে গেলো, বই পড়া বিদ্যে তো- পালামৌ এর জঙ্গলে তখনই নাকি গোটা পঁচিশেক বাঘ আছে।বিশ্বাস করুন, বনবিবির যে বাহনকে দেখার আশায় মূলতঃ জঙ্গলে ঢোকা, না তার গন্ধ পেলাম, না দেখলাম পায়ের ছাপ- দেখা তো দূর অস্ত।ছ ছটা দুরন্তযৌবন বাংলার বাঘ যে গাড়িতে সওয়ার, তার সামনে জঙ্গলের রাজারও দেখা দেওয়াটা বোধহয় সেদিন সাহসে কুলায়নি।ফেরৎ আসার সময় একটা ছোট্ট ঘটনা না বললেই নয়।ড্রাইভার এক জায়গায় হঠাৎ ব্রেক কষলো,”ডাহিনা তরফ দেখিয়ে বাচ্চা হাতি”, আর সাথে সাথে ধুপ আওয়াজ।জঙ্গলের সবচেয়ে বিপদজনক এবং অন্যায় কাজটা করে বসলো আমার এক বন্ধু।জীপ্ এর পিছন থেকে ক্যামেরা শুদ্ধু লাফিয়ে পড়লো মাটির শুঁড়িপথে, কাছ থেকে ছবি তুলবে বাচ্চা হাতির।ক্যামেরার কথায় পরে আসবো, বিশ্বাস করুন, সিনেমায় দৃশ্যের ফাস্ট রিভার্স বা রোল ব্যাক দেখেছি, কিন্তু তখন বাস্তবে সেটাই দেখলাম।যে তৎপরতায় বন্ধুটি লাফিয়েছিলো, তার দ্বিগুন ক্ষিপ্রতায় স্প্রিং এর মতো লাফিয়ে জীপে উঠে এলো সে।জিজ্ঞেস করলাম, ছবি তুললি না, সে আঙুল তুলে দেখালো – জীবনে প্রথম গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা দাঁতাল দেখলাম, সন্তানস্নেহে মানুষের মতোই সে সযত্ন।ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল, পঞ্চায়েত ক্যান্টিনের সেই খাওয়া আজও ভুলিনি।রাতে বিচ্ছানায় শুতেই,”ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু”, কিন্তু ঘুম যে কিছুতেই আসছে না- কাল সকালে উঠেই যে যাবো আমার প্রেয়সীর কাছে, সুন্দরী কোয়েল যে আমার অপেক্ষায়- “আমি আসছি, তুমি সাজো কোয়েল”।

        পালামৌ এর জঙ্গলে সকালে ঘুম ভাঙাটা একদম অন্যরকম,শহুরে আমি-এতো পাখির ভিন্ন ভিন্ন ডাক শুনিনি কোনোদিন, সালিম আলী পড়া থাকলে হয়তো চিনতেও পারতাম কয়েকটাকে।নাঃ, আর দেরি করা যাবে না, রোদ বেশি বাড়লে তার সাজ যে নষ্ট হয়ে যাবে- মোহময়ী কোয়েল যে বসে আছে আমার কাছে ধরা দেবার অপেক্ষায়।লড়ঝড়ে স্থানীয় বাস নামিয়ে দিয়ে গেলো প্রায় সাত আট কিলোমিটার দূরে।একটা রেলের ব্রিজ ছাড়া সেই মুহূর্তে আর চোখে কিছুই পড়ছিলো না।   

কেচকীতে দূরে আবছা রেলওয়ে ব্রিজ

ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বেরোলো, ছবি উঠতে থাকলো- ক্লিক ক্লিক আওয়াজটা মনে পড়তেই, ক্যামেরার দু চার লাইন বিবরণ না লিখে থাকতে পারলাম না।তখন বোধহয় আগফা কোম্পানির একটা ক্যামেরা ছিল আমার, তাই তখন অনেকের কাছে অধরা।সেই ক্যামেরার মাথায় আলাদা করে ফ্ল্যাশ লাগাতে হতো, বেড়াতে যাওয়ার আগে প্রথম কাজ ছিল তাতে ফিল্মের রোল ভরা।ফুজি আর কোডাক এই দুটো নামই মনে আছে নেগেটিভ এর এক একটা রোল, তা ক্যামেরায় ভরার কায়দা এবং কষ্ট দুটোই ছিল- এরপর ফেরৎ এসে ফটোর দোকানে ছুটতে হতো ছবি প্রিন্ট করতে।রাস্তা থেকে হেঁটে একটু এগোতেই প্রকৃতি তার অপিরিসীম সৌন্দর্য খুলে ধরলো আমার সামনে।জায়গাটার নাম কেচকি, অনেকেই হয়তো দেখেছেন তাকে, তবে আমি তাকে দেখেছি সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে, ভাঁজে ভাঁজে- পরতে পরতে অপার্থিব আকর্ষণ ছড়িয়ে সুন্দরী সেজে বসে থাকতে।বিভঙ্গি কোয়েল আর উচ্ছসিত ঔরঙ্গা এসে মিশেছে কেচকিতে।দুজনেরই গভীরতা হয়তো কম, কিন্তু গভীরতা কি কখনো সৌন্দর্যের মাপকাঠি হয়? নদীর বুক থেকে তোলা রেলের ব্রিজ এর ছবি আজও আমার কাছে আছে, অনেকক্ষন বসে ছিলাম- একটা রেলগাড়ি যদি যায়।ব্রিজ এর উপর মালগাড়ি দেখেছি,রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে উপর থেকে সঙ্গমরত কোয়েল আর ঔরঙ্গা কে দেখেছি,দুধারে সবুজ প্রকৃতি আর আমরা, নীরবতায় এই মিলন- সাক্ষী শুধু আমরা কজন।

সঙ্গমরত কোয়েল আর ঔরঙ্গা

হাস্যকর একটা ছেলেমানুষি মনে পড়ে গেলো, কোয়েলের কাছে এলাম, তাকে ছুঁয়ে দেখবো না,এই ইচ্ছেকে মর্যাদা দিতে গিয়ে নেমে পড়েছিলাম কোয়েলের বুকে।সামান্য দুহাত গভীর জলে আমার সাঁতার কাটার এক প্রাণান্তকর হাস্যকর প্রচেষ্টার সাক্ষী হয়ে থাকলো সুন্দরী কোয়েল।   

       ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিলো – নাঃ আজ আর বেশি রাত করা যাবে না, ব্যাগপত্তর গোছাতে হবে।মধুবন,তোমার অবয়ব যতই মলিন হোক, তোমার স্মৃতি নিয়ে কাল বিদায় নেবো আমি – তুমি আমায় এই কদিনে দিয়েছো আশ্রয়, সুযোগ করে দিয়েছো প্রকৃতিকে আলিঙ্গন করার – জঙ্গলকে দুচোখ ভোরে দেখার, আর সবার শেষে সুন্দরী কোয়েলের বুকে অবগাহনের। বিদায় পালামৌ, কাল যাবো ছোটোনাগপুরের রানীর কাছে, সে যে স্বপ্নসুন্দরী।       

                                                                                       (চলবে)

4 1 vote
Rate this article
Facebook
Twitter
LinkedIn
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
Categories
Recent Topics
Picture7
স্বেচ্ছাবন্দির নামচা (দ্বিতীয় পর্ব)
মেদিনী রায়ের গড় দেখে ফিরে দুপুরের একটা ছোট্ট ভাতঘুমের পর বেলা পড়তেই বিকেল...
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x