House Of Soul

Reg. No: S0018301 of 2021-2022

+91 9674173922

hos.kol2021@gmail.com

A-81, New Raipur Road

Kolkata 700 084

Blog

জীবন পথিকের চোখে – ১

অমিত মুখোপাধ্যায় এক জীবন পথিক। তাঁর অপরূপ গদ্য কবিতার মত রোমক এবং শ্লোকের মতো উদ্দীপক। ওনার লেখা কিছু মুক্ত গদ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরা হলো এখানে।

 

 মুক্ত গদ্য

 অমিত মুখোপাধ্যায়

 

 

কোয়েল

কোয়েল যখন ভাসায় তখন তীব্র স্রোতে ভাসায়। অন্য সময় পালামৌয়ের এই নদীর প্রশস্ত বালুকাময় বুকে শীর্ণ জলধারা বয়ে যায়। তবে নদীতে জল থাকুক না থাকুক,  মাঝে মাঝে ইচ্ছের নৌকাগুলির কাছি খুলে দেওয়া দরকার। কারণ যে বেপরোয়া ভাসতে জানে না, সে ডুব দিতেও জানে না। ভেসে থাকা বা ভেসে যাওয়া খুব সহজ নয়। ঠিক যেমন সহজ নয় ইচ্ছের বেপরোয়া নৌকাগুলিকে যথাযথ  ঠিকানায় ভাসিয়ে দেওয়া। লোকলজ্জা, অপরাধবোধ, নিজেকে চিনতে না পারা ইত্যাদি কিছুতেই  ইচ্ছের নৌকার পালে হাওয়া লাগতে দেয় না।  কম তো গা ভাসাইনি! নদীয়ার তেহট্টে জলঙ্গী নদীর জলে আধ শোয়া হয়ে ভেসে থেকে পাশের খেত থেকে তোলা তরমুজ খাওয়া এখনও ভুলিনি। ডুয়ার্সের চিলাপাতায় বুড়ি নদীতে গা ভাসিয়ে জলতরঙ্গ বাজানোর স্মৃতি এখনও টাটকা। তিব্বত থেকে আসা বরফ গলা জলের তোর্সা নদীতে গা ভাসাতেই নিজের ভিতরে থাকা নদী ছলাৎ ছল করে উঠেছিল। ত্রিপুরার কৈলাশহরে সোনামারা গ্রামে মনু নদীতে গা ভাসিয়ে ঝুঁকে পাড়া গাছের সঙ্গে গল্প করার স্মৃতি আজও বহমান। এই সব ভেসে থাকা, ভেসে যাওয়া নিজের মধ্যে ডুব দিতে শেখায়। ইচ্ছের নৌকোগুলির কাছি খুলে দেয়। পালামৌয়ের এই কাঠ ফাটা রৌদ্রের সকালে চাই, সবার মন নদীতে জোয়ার আসুক। সবার ইচ্ছার নৌকা ভেসে যাক দিল দরিয়ায়। পালামৌয়ের গারু বন বিশ্রামাগার থেকে জানাই সুপ্রভাত।

 

কুহক

রহস্যময় কুহকে যে রোমাঞ্চ আছে কুয়াশা কেটে আলো ফোটায় তা নেই। প্রকৃতি রহস্যের অনন্ত মায়াজাল বিছিয়ে রেখেছে। আমি সেই মায়াজালে জড়িয়ে আছি। তাই শুধু রহস্যই খুঁজি। হিম কুয়াশা মেখে হিমালয়ের গ্রামে জঙ্গলে ঘুরে তাকে খুঁজেছি। অর্কিডের গায়ে জমে থাকা হীরক কুঁচির মতো জলকণায় তাকে খুঁজেছি। সাহেবগঞ্জের মাঝ গঙ্গায় নৌকায় পা ঝুলিয়ে বসে জল খেলতে খেলতে তাকে খুঁজেছি। উদবিড়ালের সাঁতার দেখতে দেখতে তাঁকে খুঁজেছি। থর মরুভূমির বুকে নকশা কেটে হেঁটে চলা পোকাটিকে দেখতে দেখতে বা কাংড়া উপত্যকার গাছে অচেনা পাখির ডানায় তাকে খুঁজেছি। গঢ়ওয়ার মাঠে পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়  ছুটে চলা নীলগাইয়ের ঝাঁকে তাকে খুঁজেছি। হিমাচলের সজলা গ্রামে মাইনাস ষোলো ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জমে যাওয়া ঝর্ণায় তাকে খুঁজেছি। তার সন্ধান করেছি দণ্ডকারণ্যে বয়ে চলা তমসা নদীর তীরে। সন্ধান করেছি সুন্দরবনের কাদায় আশ্চর্য মাছের বুকে হেঁটে চলায়। রহস্য খুঁজেছি দূরপাল্লার ট্রেনে সহযাত্রী মেয়েটির চাহনিতে বা সহযাত্রী পুরুষটির হাতে থাকা আধ খোলা বইয়ে। হ্যাঁ, আজন্ম আমাকে টেনেছে অপার রহস্যময়তা। আলো আঁধারি। আজও সেই রহস্যের সন্ধানী, মীমাংসার নয়। একদিনের কলকাতাবাস সেরে আজ পালামৌয়ের পথে যাত্রা শুরুর আগে কামনা করি, যে কদিন বাঁঁচবো যেন প্রকৃতি তার রহস্যের মায়াজালে জড়িয়ে রাখে।

 

স্বপ্নের বীজ

তাকে চাই। জীবনের পরিসরে, মনে ও শরীরে তাকে চাই। আষাঢ়ে যেভাবে বৃষ্টি পড়ে সবুজ পাতায়, তেমনি ভিজিয়ে তুলুক সে  আমাকে। আমি সেই জলকণা তারই অস্তিত্বের অফুরান রোদ্দুরে শুকিয়ে নেব। তার ঘন ঘাসের আর্দ্রতায় আমার স্বপ্নের বীজ অঙ্কুরিত হয়।

আচমকাই সে ঝোড়ো বাতাস হয়ে বইতে থাকুক। ঝরে যাক আমার এ জীর্ণ জীবনের হলুদ পাতার মতো যাবতীয় ভুল। আমি তার পলিমাটির মতো পিঠে আঁক কাটব। পদ্য লিখব কুহকে আঙুল ডুবিয়ে। তার পায়ের পাতায় লেগে থাকা ধুলো বালি কাদার কাহিনিতে  আমি দিগন্তের গন্ধ পাই। সেই দিগন্তে পৌঁছাবার জন্য আমি একটা রাস্তার ছবি আঁকতে চেষ্টা করি। সেই রাস্তা কখনও আমাকে দেশের মুখ দেখায়। মিশে যাই মানুষের ভিড়ে। একক থেকে এ ভাবেই ছুঁয়ে ফেলি সমষ্টিকে।  আবার সেই রাস্তাই আমাকে  অরণ্যের গহনে বয়ে চলা স্রোতস্বিনীর কাছে নিয়ে যায়। তার কূলে বসে সমষ্টি থেকে একাকী হয়ে যাই। এ ভাবেই মুহূর্তে বদলে নিতে পারি নিজেকে। হ্যাঁ, যাকে ছোঁয়ার জন্য এই আকুতি, সে আমার প্রকৃতি স্বরূপা। তাকে আরও একবার চিনে নিতে চলেছি পালামৌয়ের জঙ্গলে। যেখানে অপেক্ষা করে আছে নেকড়ে অভয়ারণ্য, জলপ্রপাত, প্রশস্ত শুকনো বুকে শীর্ণ জলধারার নদী ও আদিম জনজাতির গ্রাম। 

 

মানুষের থাবা

নেকড়ে অভয়ারণ্যের আকাশে ওঠা পূর্ণিমার চাঁদ অস্ত গেছে। জ্যোৎস্না মুছে দিয়ে দিনের আলো ফুটেছে মহুয়াডাঁড়ে। শিকারে বেরনো নেকড়ের পাল ফিরে গেছে অরণ্যের গভীরে থাকা সুড়ঙ্গে। আজ যাব বুঢ়াঘাঘ নদী পার করে ওরসা পাহাড়ে। পলামু ব্যাঘ্র প্রকল্পের এই পাহাড়টি ঝাড়খণ্ডে হলেও একদম ছত্তিসগঢ় সীমানায়। ওরসা পাহাড়ে আজ রাখীবন্ধন। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে অরণ্য রক্ষার শপথ নিয়ে গাছেদের রাখী বাঁধবে গ্রামের মানুষ। বাজবে মাদল। আদিম ছন্দে নাচ হবে। সঙ্গী বন আধিকারিক বললেন, এই যে নীচে সব তেতে পুড়ে ছাই হচ্ছে ওরসায় তেমনটি নয়। প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফুট উচ্চতার এই পাহাড়ের উপর তাপমাত্রা অনেকটাই কম। কিন্তু নীচে, এই মহুয়াডাঁড়ে সকাল সাড়ে ছটায় তাপমাত্রা চড়তে শুরু করেছে। পালামৌ বরাবরই অতি শীত, অতি গরমের অঞ্চল হলেও এখনকার মত উষ্ণ পালামৌ আগে অকল্পনীয় ছিল। এই উষ্ণতা বৃদ্ধি ও অতি কম বৃষ্টিপাতের কারণ পরিবেশ ধ্বংস। ব্যাপক গাছ কাটা, খনিজের বেপরোয়া খনন, অতিরিক্ত ইট সিমেন্টের নির্মাণ, পালামৌ সহ সর্বত্র পরিবেশ বদলে দিয়েছে। উন্নয়নের নামে লোভের অনিয়ন্ত্রিত প্রকাশ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ধরিত্রী আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিস জোগানোর দায়িত্ব পালন করে এসেছে বরাবর। আর আমরা তাকে লোভ-লালসার শিকারে পরিণত করেছি। এ বার থামতে হবে। আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসের শপথ হোক সুস্থায়ী ও প্রকৃতিবান্ধব উন্নয়নের। আসুন, শপথ নিই মানুষের লোভের উপর নিয়ন্ত্রণ আনার। পরিবেশ বাঁচুক। মানুষ বাঁচুক।

4 1 vote
Rate this article
Facebook
Twitter
LinkedIn
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Abc
Abc
1 year ago

Nice article

Dhurjati
Dhurjati
10 months ago

অসাধারণ

Categories
Recent Topics
vagabond's diary
জীবন পথিকের চোখে - ১
অমিত মুখোপাধ্যায় এক জীবন পথিক। তাঁর অপরূপ গদ্য কবিতার মত রোমক এবং শ্লোকের...
3
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x